চাঁদের জন্ম লগ্ন থেকেই শুরু করা যাক।পৃথিবীর সবসময় চাঁদ ছিল না, তাহলে এটি কোথা থেকে এলো? তত্ত্ব অনুযায়ী, মঙ্গল গ্রহের আকারের একটি বস্তু, যার নাম থিয়া (Theia), প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। তির্যক কোণে আঘাত করার ফলে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে, যা পরে একত্রিত হয়ে চাঁদ গঠন করে।
পৃথিবী আর এর সদ্য গঠিত চাঁদ একে অপরকে মহাকর্ষীয় বল দিয়ে টানে। এটা আমরা সবাই জানি। এই টান পৃথিবীর ঘূর্ণন ধীরে ধীরে কমিয়ে দিয়েছে। ফলে এক সময় পৃথিবীর দিন যেখানে মাত্র প্রায় ৫ ঘণ্টা ছিল, তা এখন বেড়ে ২৪ ঘণ্টা হয়েছে। আজও চাঁদ পৃথিবীর ঘূর্ণন একটু একটু করে কমাচ্ছে যদিও খুবই সামান্য, প্রতি শতাব্দীতে মাত্র ০.০০২ সেকেন্ড।
চাঁদের এই মহাকর্ষীয় টান শুধু ঘূর্ণনই নয়, পৃথিবীর অক্ষের হেলানো অবস্থাকেও স্থির রাখতে সাহায্য করেছে। বর্তমানে পৃথিবীর অক্ষ প্রায় ২৩.৫° কোণে হেলে আছে, আর এই স্থির হেলানই আমাদের নিয়মিত ঋতু এবং তুলনামূলক স্থিতিশীল জলবায়ুর জন্য দায়ী। যদি চাঁদ না থাকত, তাহলে পৃথিবীর অক্ষ এদিক-ওদিক দুলতে থাকতো এবং জলবায়ু অনেক অস্থির হয়ে যেত। জলবায়ুর অস্থিরতার কারনে বাস্তুতন্ত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তো। বিভিন্ন প্রজাতির গন বিলুপ্তি ঘটতো৷
পৃথিবীর প্রায় ৭০% অংশ জুড়ে আছে মহাসাগর বা পানি। এই মহাসাগরে প্রতি প্রায় ১২.৫ ঘণ্টা পরপর জোয়ার-ভাটা হয়। জোয়ার-ভাটার পেছনে কাজ করে পৃথিবীর ঘূর্ণনের প্রভাব, চাঁদের মহাকর্ষীয় টান এবং সূর্যের আকর্ষণ। তবে এর মধ্যে চাঁদের প্রভাবই সবচেয়ে বেশি, সূর্যের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
জোয়ার-ভাটার ধরন চাঁদের অবস্থার ওপরও নির্ভর করে। যখন চাঁদ ও সূর্য একই সরলরেখায় থাকে, অমাবস্যা বা পূর্ণিমার সময তখন তাদের সম্মিলিত টানে বড় জোয়ার (Spring tide) হয়। আর যখন চাঁদ প্রথম বা তৃতীয় চতুর্থাংশে থাকে, তখন জোয়ার কম হয়, যাকে Neap tide বলা হয়।
চাঁদ যখন প্রথম তৈরি হয়, তখন এটি আজকের মতো এত দূরে ছিল না বরং অনেক কাছাকাছি ছিল (যদিও ১২,০০০ কিমির বেশি দূরে)। এখন চাঁদের গড় দূরত্ব প্রায় ৩৮৪,৪০০ কিমি। কাছাকাছি থাকার কারণে তখন জোয়ার-ভাটা অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল। ধারণা করা হয়, এই শক্তিশালী জোয়ার প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে মহাসাগরের মিশ্রণ এবং জীবনের প্রাথমিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
জোয়ার-ভাটা আর পৃথিবীর ঘূর্ণন চাঁদের ওপরও প্রভাব ফেলে। এই প্রভাবের কারণে চাঁদ ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে প্রতি বছরে প্রায় ৩.৮২ সেন্টিমিটার।
তাহলে কি হতো যদি চাঁদ কখনও না থাকত?
পৃথিবী আজকের মতো হতো না। তখন পৃথিবীর দিন হতো মাত্র ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার। এত দ্রুত ঘূর্ণনের কারণে বাতাসের গতি হতো অনেক বেশি প্রায় ১৬০ থেকে ২০০ কিমি/ঘণ্টা। পৃথিবীর অক্ষ স্থির না থেকে দুলতে থাকত, ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তাপমাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন হতো। বর্তমানের মতো তখন নিয়মিত ঋতু দেখা যেত না। জলবায়ুর অস্থিরতা ও অনিয়মিত ঋতুর কারনে বর্তমান পৃথিবীর এই বাস্ততন্র হয়তো সৃষ্টি-ই হতো না। আর সমুদ্রে জোয়ার-ভাটা থাকলেও তা হতো অনেক দুর্বল, কারণ তখন কেবল সূর্যের প্রভাবই কাজ করত।