1 min to read

‘সুপার ৩০’ মুভির ‘হৃতিক রোশন’ চরিত্রটি বাস্তবের ‘আনন্দ কুমার’

“SUPER 30” মুভি যারা দেখেছে তারা  অনেকে অনুপ্রাণিত হয়েছে মুভিটির গল্প থেকে। মুভিটা দেখার পর এটা আমার পছন্দের মুভির মধ্যে একটা হয়ে গেসে। মুভির অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে প্রধান চরিত্রে ‘হৃত্বিক’ তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরাটা দিয়েছেন এই মুভিতে। আমরা কি জানি?
মুভিতে ভারতীয় গণিত শিক্ষক আনন্দ কুমারের জীবনকাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। কে এই গণিতবিদ, আজকে আমরা তার সম্পর্কে জানতেই যাচ্ছি।

আনন্দ কুমার কে ?
আনন্দ কুমার এর জন্ম ১ জানুয়ারী ১৯৭৩ , ভারতের বিহারের পাটনা শহরে। তিনি ”সুপার ৩০”  প্রোগ্রামের জন্য সর্বাধিক পরিচিত, যা তিনি ২০০২ সালে বিহারের পাটনাতে শুরু করেছিলেন এবং আইআইটি-জেইই-র সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষক, ভারতীয় প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটগুলির প্রবেশিকা পরীক্ষা (আইআইটি)।
২০১৮ এর মধ্যে, ৪৮১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪২২ জন আইআইটি-তে চান্স পেয়েছে। তাকে নিয়ে ২০১৯ এর ”সুপার 30” ছবি তৈরি করেছে পরিচালক বিকাশ বাহল, যেখানে আনন্দ কুমার চরিত্রে অভিনয় করেছেন হৃতিক রোশন।

শিক্ষাজীবন:
তাঁর বাবা ভারতের ডাক বিভাগে একজন কেরানী ছিলেন।তাঁর বাবা তাদেরকে প্রাইভেট স্কুলে পড়াশোনা করাতে পারেন নি এবং তিনি একটি হিন্দি মাধ্যমের সরকারী স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন, যেখানে তিনি গণিতের প্রতি গভীর আগ্রহ গড়ে তোলেন। শৈশবে, তিনি বিহারের পাটনা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলেন।
স্নাতকোত্তরকালে,পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারটিতে বিদেশী জার্নাল না থাকায় কুমার প্রতি সপ্তাহে ছয় ঘন্টা ট্রেনে বারাণসী ভ্রমণ করে একটি বিদেশী গণিত জার্নাল সমাধান করতে বারাণসী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে যায়। একদিন, ম্যানেজার অবশেষে তাকে ধরে, এবং বলে যে সেখানে তার পড়ার কোনও অধিকার নেই।
“ফুনশুখ ওয়াংডু” চরিত্রটি বাস্তবের “সুনাম ওয়াংছুখ”-জানতে ক্লিক করো এখানে

একজন কর্মী সদস্য তাকে সংবাদপত্রের একটি নিবন্ধে বৈশিষ্ট্যযুক্ত হওয়ার পরামর্শ দেয়, যাতে তিনি বিখ্যাত হন এবং জার্নালের বিনামূল্যে চাঁদা পাবেন। সংখ্যা তত্ত্ব সম্পর্কিত কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন, যা গাণিতিক বর্ণালীতে প্রকাশিত হয়েছিল।

তিনি স্নাতককালীন সময়ে গণিত গেজেট এর সম্পাদককে একটি চিঠিও প্রেরণ করেছিলেন।

কুমার কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন, কিন্তু পিতার মৃত্যু এবং তার আর্থিক অবস্থার কারণে সেখানে উপস্থিত হতে পারেননি।

তারপরে তিনি শহরে পাপড বিক্রি করেন। বিকেল গড়ালে মায়ের বানানো পাঁপড় ঠেলাগাড়িতে ভরে, ছেলে তখন ‘পাঁপড় ফেরিওয়ালা।’ অলিতে গলিতে ‘পাঁপড় নেবে গো’ হাঁক পাড়তে পাড়তেই সেরা গণিতজ্ঞ হওয়ার স্বপ্ন দেখে।
কুমার দিনের বেলায় গণিতে কাজ করতেন এবং সন্ধ্যার দিকে তার মায়ের সাথে পেপ্যাড বিক্রি করতেন, যিনি তার পরিবারকে সমর্থন করার জন্য বাড়ি থেকে একটি ব্যবসা শুরু করেছিলেন।

শিক্ষাদান জীবন এবং সুপার 30:
১৯৯২ সাল, কুমার গণিত পড়ানো শুরু করেছিলেন। ছাত্রদের অত্যন্ত প্রিয়। পাড়াতেই খুলে ফেলেন ছোট্ট টিউশন সেন্টার। নাম দেন  রামানুজন স্কুল অব ম্যাথেমেটিক্স। ছাত্র পড়ানোর পাশাপাশি, অঙ্কের উপর গবেষণা চলতে থাকে। তিন বছরে তাঁর টিউশন সেন্টারে ছাত্রদের সংখ্যাটা ৫০০ ছাড়িয়েছে।


এ দিকে ‘নম্বর থিওরি’-র উপর তাঁর একাধিক গবেষণার পেপার ততদিনে ছাপা হয়েছে ‘ম্যাথেমেটিকাল স্পেকট্রাম’ ও ‘দ্য ম্যাথেমেটিকাল গেজেট’-এ। নতুন করে বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্ন দেখতে থাকেন আনন্দ।

১৯৯৫, সুযোগ এসে যায়। একই সঙ্গে কেমব্রিজ ও শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ এসেছে। আনন্দের চোখে জল, কিন্তু হাত শূন্য। সংসারে বিধবা মা, সঞ্চয় নেই বললেই চলে।
স্বপ্নগুলোকে বাক্সবন্দি করে ফের তুলে রাখলেন মনের কুঠুরিতে। তারপরে ২০০০ সালের গোড়ার দিকে, যখন দরিদ্রতার কারণে বার্ষিক ভর্তি ফি বহন করতে না পেরে আইআইটি-জেইইর জন্য কোচিংয়ের জন্য একজন দরিদ্র শিক্ষার্থী তাঁর কাছে আসেন, কুমার ২০০২ সালে সুপার 30 প্রোগ্রাম শুরু করতে অনুপ্রাণিত হন।


অঙ্গীকার নিলেন, তাঁর মতো হাজার হাজার ছাত্রের স্বপ্ন বিফলে যেতে দেবেন না। শুরু হলো এক নতুন লড়াই। প্রতি মে, 2002 সাল থেকে, গণিতের রামানুজন স্কুল সুপার 30 প্রোগ্রামের জন্য ৩০ জন শিক্ষার্থীকে বাছাই করার জন্য একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত করে।

 অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় উপস্থিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া বিভাগ থেকে ত্রিশজন বুদ্ধিমান শিক্ষার্থী নেন এবং এক বছরের জন্য অধ্যয়নের উপকরণ এবং থাকার ব্যবস্থা করেন। তাঁর মা, জয়ন্তী দেবী, শিক্ষার্থীদের জন্য রান্না করেন এবং তাঁর ভাই প্রণব কুমার পরিচালনার যত্ন নেন।

২০০৩-২০১৮ চলাকালীন,৪৮০ এর মধ্যে ৪২২ জন শিক্ষার্থী আইআইটিতে পাস করেছে । সুপার 30 এর সাফল্য এবং এর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার পরে, তিনি বেসরকারী খাত – জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় সংস্থা – পাশাপাশি সরকারি আর্থিক
সহায়তার জন্য অফার পেয়েছিলেন, তবে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন; কুমার নিজের প্রচেষ্টা দিয়ে সুপার 30 বজায় রাখতে চেয়েছিলেন।


স্বীকার:
বিদেশে পড়াশোনা হয়নি ঠিকই, তবে অঙ্ক স্যর আনন্দ কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিতে যান। তাঁকে ডেকে পাঠানো হয় আমেরিকান ম্যাথেমেটিকাল সোসাইটি ও ম্যাথেমেটিক্স অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকাতে। তাঁর অঙ্কের থিওরি ছাপা হয় আমেরিকা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়ার জার্নালে।

তাঁর লড়াইয়ের গল্প বলে সিনেমার পর্দা, হৃতিক রোশন অভিনীত ‘সুপার ৩০।’ ২০০৯ এর মার্চ মাসে, ডিসকভারি চ্যানেল সুপার 30 এ এক ঘন্টা ব্যাপী অনুষ্ঠান সম্প্রচার করেছিল এবং নিউ ইয়র্ক টাইমসে কুমারকে অর্ধেক পৃষ্ঠা উত্সর্গ করা হয়েছিল। প্রাক্তন মিস জাপান নরিকা ফুজিওয়ারা কুমারের উদ্যোগে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করতে পাটনা সফর করেছিলেন।

কুমার বিবিসি দ্বারা প্রোগ্রামগুলিতে প্রদর্শিত হয়েছে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে কোচিংয়ের মাধ্যমে আইআইটি-জেইই পাস করতে সহায়তা করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদানের জন্য তাকে লিমকা বুক অফ রেকর্ডস (২০০৯) -তেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।টাইম ম্যাগাজিন সুপার 30 কে এশিয়া 2010 এর সেরা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।

তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন বেশ কয়েকটি আইআইটি, ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে।

জনপ্রিয়তার শিখর ছুঁয়েও অঙ্ক স্যর আনন্দ কিন্তু অবিচল, তাঁর শুধু একটাই দাবি, ‘‘এমন কত মেধা রয়েছে যারা শুধু অভাবের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা কি পারিনা তাদের পাশে দাঁড়াতে?’’

Comments (No)

Leave a Reply