1 min to read

দুইজন ক্লাসমেট:- বোস-আইনস্টাইন সংখ্যায়ন এবং সাহা সমীকরণ

১৯০৯ সাল।কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে। প্রথম হয়েছে পূর্ব ভারতীয় রেলওয়ের হিসাবরক্ষক সুরেন্দ্রনাথ বসুর ছেলে সত্যেন্দ্রনাথ বসু ওরফে সত্যেন। পরে যার নাম থেকেই নাম হয় মহাবিশ্ব গঠনকারী বোসন কণা।

আর সমগ্র পূর্ব বাংলায় ৩য় স্থান অর্জন করেছে গাজীপুরের শেওড়াতলী থেকে মাসিক ৭ টাকা বৃত্তি আর পাটকর্মী বড় ভাইয়ের পাঠানো ৫ টাকার ভরসায় ঢাকায় পড়তে আসা মুদি দোকানদার জগন্নাথ সাহার ৫ম সন্তান সাহা। যেই কিনা পরবর্তীতে হয়ে উঠেন আস্ট্রোফিজিক্সের জনক

এরপর ১৯১১ সালে দুজনেই ভর্তি হন কলকাতার প্রিন্সটন কলেজে। সেখানে শিক্ষক হিসেবে পান আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু এবং আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের মতো গুণীদের। ১৯১৩ সালের বিএসসি পরীক্ষায়য় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং ২য় হন মেঘনাথ সাহা। স্নাতকোত্তর পরীক্ষাতেও সেই একই ফলাফলের পুনরাবৃত্তি। মেঘনাথ সাহা ফলিত গণিতে ২য় এবং সত্যেন বোস ১ম হয়ে অর্জন করেন স্নাতকোত্তর ডিগ্রি।

ইতিমধ্যে কলকাতা বিজ্ঞান কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। বোস এবং সাহা দুজনেই সেখানে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। প্রথমে গণিত বিভাগে, পরে পদার্থবিজ্ঞানে। সেই সময় কলকাতা বিজ্ঞান কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের “ল্যাবরেটরি” হিসেবে ছিলো প্রিন্সটন কলেজের সমৃদ্ধ লাইব্রেরি।

সেখানে বসেই বোস এবং সাহা আলবার্ট আইনস্টাইনের ১৯০৫ থেকে ১৯১৬ সালের মধ্যে প্রকাশিত জার্মান ভাষায় লেখা জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটির প্রথম ইংরেজি অনুবাদ করেন। যার জেরক্স কপি এখনো আমেরিকার প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনস্টাইন আর্কাইভে রাখা আছে।

১৯১৯ সালের প্রথম পাঁচ মাস মেঘনাথ সাহা লন্ডনে বিজ্ঞানী আলফ্রেড ফাউলারের পরীক্ষাগারে এবং পরবর্তীতে বার্লিনে ওয়াস্টার নার্নস্টের সাথে কাজ শুরু করেন। সেই সময় জার্মান ভাষায় প্রকাশিত ওয়াস্টার নার্নস্টেরের একছাত্রের লেখা এক নিবন্ধের প্রতি আকৃষ্ট হন।

সূর্যের বর্ণালী বিশ্লেষণ করে সেখানে কিছু রেখা দেখা যায় যার উৎস বর্ণনা করা যাচ্ছিল না। নক্ষত্রের বাতাবরণে গ্যাসের অণু আয়নিত হওয়া ছিল সেই নিবন্ধেত বিষয়বস্তু। কিন্তু সেই নিবন্ধে আয়নায়নের জন্য ব্যবহৃত বিভব নিয়ে মেঘনাথ সাহার খটকা লাগে এবং তিনি নিজে উক্ত বিভব নির্ণয়ের সূত্রটি বের করেন। ১৯১৯ সালের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ বিষয়ে চারটি নিবন্ধ লেখেন।
যা পরবর্তীতে ১৯২০ সালে “ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিন”নে প্রকাশিত হয়। এই চারটি প্রবন্ধের মধ্যে “আয়োনাইফেশন অব সোলার ক্রোমোস্ফিয়ার”- এ ব্যবহৃত প্রথমে সূত্রটি এখন “সাহা সমীকরণ” নামে পরিচিত, যা ব্যবহার করে প্রথমবারের মতো সূর্যের বর্ণমণ্ডলে ফ্রনহোফার রেখাগুলোর উৎপত্তি ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়।

বিখ্যাত জোর্তিবিজ্ঞানী স্যার আর্থার এডিংটন এই সমীকরণকে জোর্তিবিজ্ঞানের শীর্ষ ১২তম আবিষ্কার হিসাবে স্বীকৃতি দেন। এরপরের ২ দশক মূলত মেঘনাথ সাহার এই সূত্রকে ঘিরেই জোর্তিপদার্থবিজ্ঞানের ভিত গড়ে উঠে। এজন্যই শেওড়াতলীর সেই ছেলেকে, ঢাকায় আসার শুরুর সময় যাকে টাকার অভাবে খালি পায়ে থাকতে হয়েছিল, সেই মেঘনাথ সাহাকে জোর্তিপদার্থবিজ্ঞানের জনক বলা হয়।

১৯২১ সালে মেঘনাথ সাহা দুই বছর বিদেশে গবেষণা করে দেশে ফিরে আসেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।
একই বছর সত্যেন্দ্রনাথ বোস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে রিডার হিসাবে যোগদান করেন। এরই কিছুদিন পর একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়ার সময় তিনি শিক্ষার্থীদের ম্যাক্স প্লাংকের বিকীরণ সূত্রটি পড়াচ্ছিলেন এবং তার যৌক্তিক গরমিল দেখানোর চেষ্টা করছিলেন।
ড্রাইভ / ড্রপবক্সের ডেটাগুলো কি আকাশে (ক্লাউড) থাকে?

বোস তার মতো করে ব্যাখ্যা করার সময় হঠাৎ-ই লক্ষ্য করেন গরমিলটি আর নেই – পুরো বিষয়টাকেই এক যৌক্তিক প্লাটফর্মে দাড় করানো যাচ্ছে। সময়টা ১৯২৪ সাল। সত্যেন বোস খুব উৎসাহ নিয়ে তার যুগান্তকারী প্রবন্ধটি লিখলেন এবং তা “ফিলোসফিকেল ম্যাগাজিন”এ পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু ম্যাগাজিন কতৃপক্ষ প্রবন্ধটিকে পাঠের অযোগ্য বলে ফেরত পাঠিয়ে দেয়।

তখন বোস তার সেই প্রবন্ধকে আইনস্টাইনের কাছে পাঠিয়ে দেন এবং অনুরোধ করেন যে যদি তিনি প্রবন্ধটিকে প্রকাশ করার উপযোগী বলে মনে করেন তবে তিনি যেন সেটাকে জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে “সাইটশ্রিফট ফুয়ার ফিজিক” জার্নালে ছাপানোর ব্যবস্থা করে দেন।
স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন বোসের আবিষ্কারের গুরুত্ব বুঝলেন এবং নিজেই একটি প্রবন্ধ লিখে জার্নালে প্রকাশ করলেন যার নিচে লেখাছিল “বোসের এই কাজটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ”। শুধু এইটুকুর জন্যই বোসের আবিষ্কারের সাথে আইনস্টাইনের নাম জুড়ে গেল এবং তাকে বোস সংখ্যায়ন না বলে বলা হতে লাগল বোস-আইনস্টাইন সংখ্যায়ন।
ততদিনে মেঘনাথ সাহা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যান এলাহাবাদে।

কারণ তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য আলাদা সময় ছিল না। সময় ১৯২৩। এর পরের ১৫ বছর তিনি এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করে যান। ১৯২৭ সালে শেওড়াতলীর সেই গরিব মুদি দোকানদারের ছেলে ব্রিটিশ রয়েল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন। ১৯৩৮ সালে মেঘনাথ সাহা আবার এলাহাবাদ ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এরই মধ্যে সত্যেন বোস ১৯২৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২ বছরের ছুটি নেন ইউরোপের সেরা বিজ্ঞানীদের সাথে গবেষণার জন্য। গবেষণা শেষে ১৯২৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন বিজ্ঞান বিভাগের ডিন হয়ে।
সত্যেন্দ্রনাথ বসু সুদীর্ঘ ২৭ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে নানান ধরণের যন্ত্র গড়ে তুলে ছিলেন তিনি। এখনো কার্জন হলের বিভিন্ন কোনায় তার ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি দেখা যায়।
ইতিহাস বলে, কোনো বাঙালি এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পাননি। কিন্তু ইতিহাসের বাইরেও কিছি ভুতুরে ইতিহাস থাকেই। সত্যেন বোসের সেই বোস-আইনস্টাইন স্ট্যাটিস্টিক্স থেকে উঠে আসা নতুন বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেশনের প্রায়োগিক প্রমাণের জন্য ২০০১ সালে ৩ বিজ্ঞানীদের নোবেল দেওয়া হয়।

ধারণা করা হয়, ২০০১ সাল পর্যন্ত বোস বেঁচে থাকলে তিনিই নোবেল পুরষ্কার পেতেন। আবার আমাদের আস্ট্রোফিজিক্সের জনক মেঘনাথ সাহাকেও ১৯৩০, ১৯৩৭,১৯৩৯, ১৯৫১ এবং ১৯৫৫ সালে নোবেল পুরষ্কারের জন্য মনোনীত করা হয়।

কিন্তু শেষপর্যন্ত তার কাজকে নোবেল কমিটি পদার্থবিজ্ঞানের উল্লেখযোগ্য প্রয়োগ হিসাবে বিবেচনা করলেও ঠিক “আবিষ্কার” নয় বলে সাহাকে নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হয়নি।
কিন্তু শেষপর্যন্ত শুধু একটি পুরষ্কারই কী বিজ্ঞানীদের অবদানকে স্বীকৃতি দেয়? আমাদের এই দুই সতীর্থ বিজ্ঞানী সেইসব গুটিকতক বিজ্ঞানীদের মাঝে অন্যতম, যাদের পুরষ্কার দিতে পারলে নোবেল কমিটি-ই ধন্য হতো।